ঈদে নতুন জামার আনন্দ (গল্প)

ঈদে নতুন জামার আনন্দ (গল্প)

রবি রানা আর রানী তিন ভাই বোন। বাবা মা সহ পাঁচ জনের পরিবার। চাউলের দাম ১২ টাকা কেজি আর আটা আট টাকা কেজি।চাউল আটার দাম যেমনি কম তেমনি দিন মজুরের দামও চল্লিশ টাকা।

বাবা রাকিব সংসার উদাসী, কবে কোন বেলা বাচ্চারা খেয়ে আছে, আর কবে না খেয়ে আছে তার হিসাব রাখাটা সে কোনোদিন প্রয়োজন মনে করেনা ।

নিজে বাড়িতে ফিরে যদি দেখে হাড়িতে ভাত আছে তবে খায় নয়তো না খেয়ে শুয়ে থাকে, কখনও খাবার খাওয়ার জন্য স্ত্রী বা ছেলে মেয়েকে কিছু জিজ্ঞাসা করে না।

তবে, মাঝে মধ্যে নিজে কোনো টাকা আয় করতে পারলে চাউল না কিনে চিড়া বা পাউরুটি আর কিছুটা চিনি কিনে বাসায় ফেরে। এসব খাবার তাঁর বাচ্চাদের জন্য নয়। নিজে নিজেই পানিতে চিনি গুলিয়ে তাতে চিড়া বা পাউরুটি ভিজিয়ে খেয়ে নেয়। কখনও খোঁজ নেয়না রবি রনি বা রানী খেয়েছে কিনা বা তারা কোথায় আছে?

manjur rahman
manjur rahman

কিন্তু রবির মা আসমা বেগম তার বাবার মতো হতে পারিনি ,কারণ ছেলে মেয়ে যে তাঁর নাড়ী ছেঁড়া ধন। নিজে ছেলেমেয়েকে অনাহারে রেখে কোনোদিন কিছু খায়না। ধান চাষের মৌশুমে রবির মা ধানের পাতা উঠানো হতে শুরু করে,ধানের পাতা রোপণ ও জমি নিংড়ানো,ধানকাটা ও ধান মাড়াইয়ের কাজ করে। ধানের মৌসুম চলে গেলে আর তিন বেলা আহার যোগাড় করা যায়না তাই বারো মাস নিয়মিতভাবে গ্রামের মধ্যে দুই তিনটি বড় বাড়িতে থালাবাসন মাজার কাজ করে। সে সব বাড়ি হতে, যে বাসি খাবার আনতে পারে তাতে সকালের নাস্তা হয়ে যায়।

রবি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র, মা মাঠে কাজে গেলে ১২টায় স্কুল হতে ফিরে দুপুরের খাবার রান্না করে ছোটো দুইভাই বোনকে খাবার দেয় আর মার জন্য মাঠে খাবার নিয়ে যায়। এমন টানাটানির সংসারে প্রতিদিনের আহার প্রায় অনিশ্চিত থাকে, যদি মা কাজ পায় তবে খাওয়াটা নিশ্চিত হয় অন্যথায় সেইসব বাসা বাড়ির বাসি নষ্ট খাবার একমত্র ভরসা।

এভাবে দিন চলতে চলতে একসময় বছর ঘুরে ঈদ আসে। সংসারে যতই অভাব থাকুক না কেনো ঈদেরদিনে সেমাই,খিচুড়ি, মাংসের আওয়োজনে কোনোদিন সমস্যা হয়নি। কারণ,রবিরা নিয়মিত ভাবে কয়েকটি বড় বাড়ি হতে জাকাত ও ফেতরার টাকা বাবদ যা পায় তাতে ঈদের দিনে খাবারের আয়োজন হয়ে যায়।

manjur rahman
manjur rahman

তারপরও ঈদ সবার কাছে আনন্দের হলেও রবির কাছে নয় কারণ অন্যান্য দিন ছেঁড়া কাপড় পরলে কেউ জিজ্ঞাসা বা খেয়াল করেনা,স্কুলের বন্ধুরা এসে কাপড়ের ছেঁড়ার মধ্যে আঙ্গুল ঢুকায়না।

বিগত বছর গুলোতে অভিজ্ঞতা হয়েছে, ঈদের মাঠে ছেঁড়া কাপড় পরে গেলে কিছু দুষ্ট বন্ধু ছেঁড়ার মধ্যে আঙ্গুল ঠেলে দিয়ে ঠাট্টা করে, বড়রাও তাঁর দিকে আড়চোখে তাকায়। রবি তা খুব ভালো ভাবেই টের পায়।

বুঝতে শেখার পর হতে প্রায় প্রত্যেক ঈদে একইভাবে পুরাতন ছেঁড়া কাপড় পরে ঈদের নামাজ পড়তে যেতে হয়। তাই ঈদের দিনে সবাই হাসি খুশিতে বেলুন বাঁশি কিনে বাঁজিয়ে আনন্দ করলেও রবির মনে আনন্দ স্পর্শ করে না।নিজের পুরাতন কাপড়ের দিকে তাকিয়ে মন মরা হয়ে থাকে। নামাজ শেষে আর মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে মন চায় না।

সব কিছু জেনে রবির মা এবার ঈদের বেশ কিছুদিন আগে রবির সমবয়সী শাহীনের আম্মুর কাছে রবির জন্য একটি জামা চেয়েছে। শাহীনের আম্মু দিতেও চেয়েছে। কিন্তু শর্ত দিয়েছে শাহীনের চাকরিজীবী বড় ভাই যেদিন শাহীনের জন্য নতুন জামা কিনে আনবে তার পরের দিন শাহীনের বাদ দেওয়া জামাটি রবির জন্য দিবে।

এই খবর শুনে রবি খুব আনন্দিত কারণ শাহীন অনেক সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের দামি শার্ট পরে আর সে যে সব শার্ট প্যান্ট বাদ দেয় তার রং চটে গেলেও কোথাও ছেঁড়া থাকেনা। আর রং যদি একটু ভালো থাকে তবে একেবারেই নতুনের মতো দেখা যাবে। রনি এবং রানীর জন্য তার মা অন্যকারো কাছে কোনো কাপড় চায়নি কারণ তারা ছোটো আর নতুন পুরাতন জামার তেমন তফাত বোঝে না।

manjur rahman
manjur rahman

ঈদের তিনদিন বাকি,রবির আর দেরি সইছে না। সে মাকে বলল মা জামা তো এখনো এনে দিলে না । রবির মা সান্ত্বনা দিয়ে বলল এনে দিবো বাবা,আজ আবার যাবো দেখি কী বলে।।

শাহীনদের বাসা গিয়ে জানা গেলো শাহীনের বড় ভাইয়ের ঈদের ছুটি শুরু হবে ঈদের আগের দিন এবং তাঁর বাড়ি পৌছাতে বিকাল হয়ে যাবে।

শীতের মৌসুম সন্ধ্যা হতেই শীতের বীরত্ব শুরু হয়। রবির মা আবার ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় শাহীনদের বাড়ি গেলেন। শাহীনের আম্মু তখন ঘর হতে একটি জামা বের করে দিলেন যার রং গাড়ো খয়েরী আর তার পরে হলুদের বিভিন্ন ডিজাইন করা, রবি দেখে খুব খুশি হলো।

জামাটি যেনো নতুনের মতো দেখা যায় এজন্য জামাটি পরিস্কার করতে সেই রাত্রেই রবি আর তার মা পুকুরে যায়। রবি কেরোসিন জ্বালিত ল্যাম্প ধরে দাঁড়ায় আর মা জামাটি সাবান দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে।

তারপর মা ছেলে একসাথে এসে বাড়ি ফিরে জামাটি ঘরের মাঝে টানানো দড়িতে শুকাতে দিলো। আগামীকাল সকালেই সুন্দর জামা পরে নিজেকে কেমন লাগবে সেসব কথা ভেবে ভেবে চোখে আর ঘুম আসছে না রবির।।

মধ্যরাত গড়িয়ে এলো ততক্ষণে একপলকও ঘুম আসেনি রবির চোখে। এর মধ্য প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে একবার উঠে বাইরে যাওয়া আসার সময় শার্টের গায় হাত বুলিয়ে দেখে তা শুকালো কিনা। বাকি রাতে মাঝে মাঝে নির্ঘুম জেগে ঘরের মধ্যে দড়ির পরে ঝুলতে থাকা জামার দিকে আবছা আলোয় তাকিয়ে তাকিয়ে রবির ঈদের পূর্ব রাত্রি শেষ হয়।

শীতের সকালে সাড়ে আটটায় ঈদের জামাত ততক্ষণেও জামাটি শুকায়নি। হাঁড় কাঁপানো শীতের মধ্যে ভিজা ঠান্ডা জামা গায়ে দিতে হবে,তাই ছাড়া এতো সকালে জামা শুকানোর আর উপায়ও নাই।তাতে রবির তেমন টেনশন নাই বরং তার এটা ভালো লাগছে যে ছেঁড়া ফোঁটা জামা গায় দিয়ে তাকে ঈদে যেতে হবে না।।

জামাটির গায়ে আরেকবার হাত বুলিয়ে রেখে এক দৌড়ে চলে গেলো পুকুর ঘাটে,রবির চোখে মুখে আনন্দের ফুলকি। প্রতিবেশী অনেকের সাথে আনন্দ উল্লাস করে সুবাসিত সাবান দিয়ে গোসল সেরে এলো। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নতুন জামা পরার পালা। রবি তেল মেখে জামাটি গায়ে দিতেই,ভিজা জামার পরশে শরীরের সব লোম কাটা দিয়ে ওঠে। একেতো ভোর সকালে গোসল করা তার পরে ঠান্ডা জামা, শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে রবি। মা, রবির থুঁতনি ধরে মাথায় চিরুনি করে দিতে দিতে বললো, ঈদের মাঠে যেখানে রোদ থাকে সেখানে গিয়ে বসবে তাহলে দ্রুত জামা শুকায় যাবে। তখন আর শীত লাগবে না।

রবি নীরব হয়ে ভাবলো,ছেঁড়া জামার ফুটোয় আঙ্গুল দিয়ে ঠাট্টা পাওয়ার চেয়ে শীতে একটু কাঁপা-কাঁপি তার চেয়ে ভালো।।

সেদিন রবি পছন্দের জামা পরলেও তার আর সেমাই খাওয়া হয়নি। গ্রামের বড় বাড়িগুলোর মধ্যে দুই বাড়িতে কা সেরে রবিকে গুছিয়ে দিয়ে তার মা আবার অন্যবাড়িতে কাজের জন্য চলে যায়, তিনি আর সেমাই রান্নার সুযোগ পায়নি।

চল্লিশ বছর পর,ঈদুল ফিতরের তিনদিন পূর্বের দিন। গ্রামের মধ্যে সেই প্রাইমারি স্কুলের মাঠ যেখানে রবি ছোটো বেলায় পড়ালেখা করেছে। দানের কাপড় নেবার জন্য দলে দলে লোক ভরে গেছে । লম্বা লাইনের একপ্রান্ত হতে কাপড় দেওয়া শুরু হয়েছে।

manjur rahman
manjur rahman

একজন অভাবী মায়ের সাথে এসেছে একটি ছোট্ট ছেলে তাদের হাতে কাপড় দিতেই ছেলেটা বলল মা এটা কি নতুন কাপড়, নাকি সৌরভ ভাইয়া আর তাঁর মা মনির ঈদের আগে বাদদেওয়ার মতো পুরাতন কাপড়?

ছেলেটির মা বলল, না বাবা এটা একেবারেই নতুন কাপড় তোমার রবি আংকেল দিয়েছেন।

ছেলেটা তখন কাপড় নিয়ে দৌড় দিয়ে যেতে যেতে বলল ওহো কি মজা কী মজা, নতুন কাপড় পরব,ঈদের নামাজ পড়ব। বাচ্চা ছেলেটির আনন্দ করার কান্ড দেখে রবির ছোটো বেলায় ভিজা জামা গায়ে দিয়ে ঈদে আনন্দ করার কথা মনে পড়ে গেলো।

আর, চোখের কোনে জমা ফোঁটাফোঁটা জল মুছতে মুছতে ভাবল,যুগযুগ সময় পার হয়ে গেলেও ঈদের দিনে একটুকরা নতুন কাপড়ের আনন্দ সেই আগের মতই আছে।

—সমাপ্ত—

123830total visits,42visits today

এস এম মঞ্জুর রহমান