পাওয়া না পাওয়ার মাঝে

ধামালিয়ার বাকার কলেজ মাঠে ঈদের মেলায় হঠাৎ দেখা। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে গায়ে চিমটি কেটে শামীম এগিয়ে গেলো মীমের দিকে।ততক্ষণেও মীম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শামীমের দিকে।মাঠের একপ্রান্তে দু’জনে এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো যে একে অপরের নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছিলো। শামীম অপলক দৃষ্টিতে গোলাপী রংয়ের ওড়নার মধ্য হতে তাকিয়ে থাকা চিরচেনা দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায় স্মৃতিময় দিনে মীমের সাথে স্কুল জীবনে ঘটা প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য রঙ্গিন আর রোমাঞ্চকর সেই দিন গুলোতে যেখানে প্রথম প্রেমের অনুভূতি গুলো স্থায়ী ভাবে আচড় কেটে আছে হৃদয়ের অলিতে গলিতে। মীমের নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে।শামীম কল্পনায় ডুবে তার কোন কিছু বুঝতে পারিনি।হঠাৎ প্রথম প্রেমের সেই চন্দ্র বদন হতে মোহিত করা মিষ্ট কন্ঠ হতে ভেসে আসে কেমন আছো তুমি?

শামীম : আমাকে এ প্রশ্ন না করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করো,উত্তর পাবে।

মীম:আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসতে,আমার জন্য স্কুল জীবনে তুমি পাগল ছিলে,আমি তখন তোমার ভালোবাসার গুরুত্ব বুঝিনি।আমি ভুল করেছি,প্রতিটি সেকেন্ড তোমার পবিত্র আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অভাব বুঝি কিন্তু কিছু করার নাই।

শামীম: কেন কিছু করার নাই? আমি তো আজো ভালোবাসি।

মীম: জানি

শামীম: হে আল্লাহ তুমি মহান,আজো আমার প্রেমিকাকে আমার অপেক্ষায় রেখেছো। আমার ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রেখেছো।ভিতরে সাতটি বছর বিদেশে ছিলাম,স্কুল জীবনে আমার প্রস্তাবে কোন সাড়া দাও নি তাই বিদেশ গিয়ে আর কারো মাধ্যমে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করিনি (তখন মীমের হাতটি ধরে) তবে বিশ্বাস করো আমার সকল স্বপ্নে তুমি রানী হয়ে থেকেছো,তোমার মিষ্টি হাসিটি কল্পনায় নিয়ে বিদেশে কষ্টের সময় গুলো পার করেছি।কিছু গয়না করেছি,সেগুলো কল্পনায় তোমার গলায় পরিয়ে ভাবি আমার বৌ কে দেখতে কেমন লাগবে।

মীম: শামীমের ঠোঁটে একটি আঙ্গুল চেপে ধরে নরম আর মায়া ভরা কন্ঠে বলল, প্লিজ এগুলো আর বলো না।আমি সইতে পারছিনা।তবে মনের মাঝে কষ্টে চেপে রাখা সত্য কথাটি তোমাকে বলতে চাই।

শামীম: হ্যা বলো,আমার জান।

মীম:আগুনে জ্বললে তবেই সোনা খাঁটি হয়।তোমার ভালোবাসার মীম যথেষ্ট বিরহের আগুনে পুড়েছে,তাই জানে ভালোবাসা কি,কার ভালোবাসা খাঁটি। আমি সত্যটি বলে মরতে চাই,তা না হলে আমার ভালোবাসাটি ব্যর্থ হবে,আমি তোমাকে ভালোবাসি, অনেক অনেক ভালোবাসি।

ততক্ষণে মীমের চোখ ছলছল করতে করতে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
শামীম তা মুছে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরতে যেতেই,মীম বলল সাবধান, তুমি ঈদ মেলায় আছো তা কি ভুলে গেছো? চারিদিকে লোকারণ্য, কেউ দেখে ফেলবে।

শামীম: ঠিক বলেছো মীম আমি ভুলেই গেছিলাম এখানে মেলা চলছে,আর চারপাশে কি বিকট আওয়াজ, কিন্তু এক বারের জন্যও মনে হয়নি আমরা এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি।
আমি যে আজ কত খুশি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবোনা,তবে উত্তরে বলি আমিও তোমাকে আজো খুব ভালোবাসি।

মীম: তবে তুমি কিন্তু ছাত্রজীবন এর চেয়ে অনেক সুন্দর আর ফর্সা হয়েছো।

শামীম: কিন্তু তোমার অবস্থা দেখে আমার মায়া হচ্ছে,তুমি আগে আরো সুন্দর ছিলে,এমন হলে কিভাবে?

এই কথা শেষ হতে না হতেই চার বছরের একটি বাচ্ছা পিছন হতে বলল আম্মু আব্বু তোমাকে খুঁজছে ,তুমি এখনি আব্বুর কাছে চলো।

শামীম: কে এই বেবী?
মীম: আমার ছেলে।
শামীম: তুমি মজা করছো!
মীম: না,সত্যিই বলছি,আর চলো শামীমের আব্বুর সাথে পরিচয় করে দেই।

শামীম: শামীমের আব্বু মানে,এই ছেলের নাম শামীম?

মীম: হ্যা তোমাকে সবসময় মনে রাখার জন্য ছেলের নাম তোমার নামে রেখেছি।

শামীম: আমি আসলে কিছুই ভাবতে পারছিনা।কেমন জানি সব এলো মেলো লাগছে।

মীম: আমাকে ভুল বুঝো না প্লিজ,ওর আব্বু নেশা করে,একজন মাতাল,নেশা করে এসে সামান্য ব্যাপারে আমাকে মারে, চুল টেনে ছিড়ে দেয়,শুধু আব্বুর ইচ্ছায় বিয়েটা হয়েছে, আমি রাজি ছিলাম না,যখন বুঝলাম আমার ভালোবাসা তুমি,তখন তুমি বিদেশ, তাই মনের কথা তোমাকে সময়মত জানাতে পারিনি,অনিচ্ছায় বিয়ে করেছি।তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমি সুখি হতে পারিনি।

শামীম:এমন করে আর বলনা মীম,তুমি আমার ভালোবাসা,তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন গড়ি,কল্পনার সব রং দিয়ে তোমাকে সাজিয়ে রানীর আসনে দেখি,আমাদের এ ভালোবাসায় কোন কলঙ্ক ছিলোনা তবে কেনো জীবনটা এমন হলো?

মীম: এসব প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় এখন নয়,দ্রুতনাগেলে শামীমের আব্বু রাগকরবে।

পাশে বিক্রি হতে থাকা একটি গ্যাসীয় বেলুন শামীম কিনে বেবীটার হাতে দিয়ে বললো এটা তোমার জন্য বাবা।

বেবীটা খুশিতে বেলুন নিয়ে দৌড়াল বাবার দিকে,আর পিছে মীম। শামীম মীমের গমন পথে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে বুকের মাঝে একটা টান অনুভব করতে থাকলো, মীম কিছু টা দূরে যেয়ে পিছন ফিরে টাটা জানালো।
তখন কেঁদে কেঁদে বলতে মন চাইছিলো দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলুক

কোথায় চলেছো সাথী আমার
ফেলে বসন্ত বেলা?
নরকের মাঝে ফেলে আমায়
চাইছো অবহেলা।

আবারো মীম টাটা দিলো কিন্তু শামীম অনুভূতিহীন নিথর দেহে মনেতে গেয়ে চলেছে…

যেওনাআ সাথী যেওনাআ সাথী
আমার সুখেরও বাআআতি
তুমি হীনে মরন ভাআলো
অন্ধওকার এই রাআআতি।

এরই মধ্যে বেবীর হাত থেকে বেলুন 
উড়ে গেলো, সেই ঘটনায় মেলায় আর একবার শোরগোল শুরু হলো,সবাই আঙ্গুল উচিয়ে হৈচৈ আর ঐ ঐ করে করে আনন্দে মেতে উঠলো।

কিন্তু পরিবেশটি শামীমের কাছে লাগছিলো ধ্বংস স্তুপের মতো। যার মধ্য হতে মৃত ভালোবাসার গলিত লাশের গন্ধ বেয়ে আসছিলো,যা বাতাসে মিশে শামীমের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছিলো কিছুক্ষণ পরে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শামীম নিজের অস্তিত্ব বুঝতে পারে।ততক্ষণে মীম নিজের বাড়ির পথে অনেক পথ এগিয়ে চলেছে,চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেছে মীম।শামীম ও এক বুক ব্যথা নিয়ে পিছন ঘুরে পা বাড়ালো…..

©><সমাপ্ত><©

672total visits,1visits today

এস এম মঞ্জুর রহমান

Leave a Reply