বাবাদের অন্যরকম আত্মত্যাগ

চাকুরির জীবন।বাসাবাড়িতে বউ আর দুই বছরের বাচ্চা সহ তিনজনের সংসার।বাংলাদেশী সংস্কৃতি মেনেই চলছে জীবন। স্ত্রী ঘর সামলায় আর আমি বাহির।ছেলেটার বয়স কখন দুই বছর পার হলো তা বাবা হিসাবে মোটেই টের পাইনি। ছেলেটা মায়ের কাছেই বড় হচ্ছে।আমার সাথে তার পরিচয় খুব কম।সে ঘুমে থাকা অবস্থায় অফিসে যাই আবার অনেক দিন সে ঘুমালে আমি বাসায় ফিরি।তার পরও সুখী জীবন।শুক্র শনিবার সাপ্তাহিক ছুটিরদিন।

গতকাল ছিলো আমার জন্মদিন,আজ শুক্রবার সকালে ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে একটি বাটিতে স্ত্রীর নিজের হাতে বানানো কেক খাচ্ছি।বাচ্চাটা তার খেলনা গাড়িটা চড়ে একবার আমার কাছে আসছে আবার টাটা বাইবাই জানিয়ে অন্য রুমে চলে যাচ্ছে।এসময় ছেলের মা কিচেনে নাস্তা তৈরিতে ব্যাস্ত।

ছেলের গাড়ি চালানোর মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকে এক এক টুকরা কেক নিয়ে খাচ্ছে।

হঠাৎ দেখি আব্বু সোনা আমাকে বলতে শুরু করেছে।
আব্বু কান্দো।আব্বু কান্দো।আব্বু কান্দো।

আমি বিষয়টি বুঝতে না পারায় তার মা কিচেন থেকে বললো তোমাকে কান্নার অভিনয় করতে বলছে।

আমি একটু ছেলেমিতে কান্নার অভিনয় করলাম।হাতের কব্জি দুখান দুই চোখের পরে রেখে আঙুল গুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললাম উউউউউউউউ
আব্বুউউউউ৷ উউউউউউউ আব্বুউউউউউ

ছেলে তখন খেলনা গাড়ি হতে নেমে এসে,তার পরনের প্যান্টের পকেট না থাকলেও তার ভাবটা এমন যেনো, সে পকেটের মানি ব্যাগ হতে টাকা বের করছে।তার পর আমার হাতে দিয়ে বলল এইনিন টাকা,আর কানেনা,আর কানেনা।

এভাবে বার বার চলছে বাপ বেটার মিথ্যা কান্নার অভিনয় আর মিষ্টি কিনতে টাকা দিয়ে ছেলের গাড়ি চড়ে চলে যাওয়া পালা।

আমি বিষয়টি ক্লিয়ার হতে বললাম,এই লিমা শুনছো দেখো বাবু কি করছে।

সে বললো বুঝলে না?
আমি বললাম না।

একটা হাসি দিয়ে লিমা বলল, অফিসে যাবার সময় ও কান্না করলে তুমি তাকে যে টাকা দিয়ে কান্না থামতে বলো,এটা সেই অভিনয়।

হিহিহি হাসিটা আর ধরে রাখতে পারলাম না।ছেলের মামমাম ও হাসলো আমার সাথে।

হাসি থামিয়ে সে বলল তুমি বাস্তবে এটা করো আর সারাদিন সে আমার সাথে এই খেলা খেলে।এটা আমাদের মা ও ছেলের সময় কাটানোর খেলা।

কথাটা শুনে অবাক হয়ে বাবুকে জড়িয়ে ধরে আদর দিলাম।তার বুদ্ধি বাড়ছে দেখে ভালো লাগলো। সাথে সাথে একটা দুঃখও পেলাম যা শুধু বাবারাই বুঝবেন।

ছেলে মেয়ে বড় হবার সময় তাদের সাথে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে এমনি কত যে সুখের ঘটনা ঘটে যা বাবারা প্রতিদিন মিসকরে। মিস করে সন্তানরাও তার বাবাকে। বাবাদের প্রতিনিয়ত চলছে এমন সুখ বিসর্জনে ঘটনা যা,সন্তান আর পিতাদের এক অন্যরকম আত্মত্যাগ।

তবুও বাবারা সন্তানের ফুলের মতো মুখটা স্বল্প সময় দেখতে পেয়েও খুশি থাকে, সন্তানদের সাথে অটুট থাকে বাবার আন্তরিক ভালোবাসার এক পবিত্র বন্ধন।

—সমাপ্ত–

2654total visits,53visits today

এস এম মঞ্জুর রহমান